মাশরাফির নেতৃত্ব দক্ষতা অসাধারণ,তার কারণেই আমি সিলেটের কোচ’ রাজিন সালেহ

শুরুর আগে বিপিএল নিয়ে যত তীর্যক কথা-বার্তাই শোনা যাক না কেন, মাঠের ক্রিকেটটা আলো ছড়িয়েছে। আর দল হিসেবে সবার নজর কেড়েছে মাশরাফির সিলেট স্ট্রাইকার্স।মাশরাফি আর মুশফিকুর রহিম ছাড়া সে অর্থে একজন তারকাও

নেই দলটিতে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি পারফরমারও বেশ কম। কিন্তু সেই দল মাঠে ভালো খেলে এখন পর্যন্ত সবার ওপরে।অথচ কাগজে-কলমে সিলেট ছিল চার নম্বরে- কুমিল্লা, বরিশাল আর রংপুরের পরে। কিন্তু মাঠে সেই দল

রীতিমতো দুর্দমনীয়। অধিনায়ক মাশরাফির যোগ্য, দক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্ব আর তিন তরুণ তৌহিদ হৃদয়, নাজমুল হোসেন শান্ত আর জাকির হাসানের সাথে অভিজ্ঞ মুশফিকের সমন্বয়ে মাঠে সিলেট স্ট্রাইকার্স দুরন্ত, দুর্বার। অবশ্যই সিলেটকে

একটা ‘ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার মূল কৃতিত্বটা অধিনায়ক মাশরাফির। তাই মাশরাফিকে নিয়েই যত কথা, যত প্রশংসা ও বন্দনা।মাশরাফির নাম-ডাক আর তারকা খ্যাতির কাছে ঢাকা পড়ে গেছেন; কিন্তু সবার অলক্ষ্যে সিলেটের এমন

উত্থানের পেছনে আছেন বাংলাদেশেরই একঝাঁক সাবেক ক্রিকেটার; রাজিন সালেহ আলম, তুষার ইমরান, সৈয়দ রাসেল, নাজমুল হোসেন আর ডলার মাহমুদ। যারা প্রধান কোচ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোচের দায়িত্ব পালন করছেন।আলোচিত,

আলোড়িত সিলেটের হেড কোচ হিসেবে কাজ করছেন সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার রাজিন সালেহ আলম। অভিষেক টেস্ট ম্যাচে একাদশে জায়গা পাননি; কিন্তু স্কোরকার্ডে তার নাম আছে। দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে বদলি ফিল্ডারের ভূমিকায় নেমে অধিনায়ক

নাইমুর রহমান দুর্জয়ের বলে ক্লোজইনে মুরালি কার্তিক ও শচিন টেন্ডুলকারের দু-দুটি কঠিন ক্যাচ অনায়াসে মাটিতে শরীর ফেলে ধরে নজর কেড়েছিলেন রাজিন সালেহ আলম।দেশের হয়ে ২৪টি টেস্ট খেলে কোনো সেঞ্চুরি নেই। তবে ৪৩টি

একদিনের ম্যাচে কেনিয়ার বিপক্ষে (২০০৬ সালের ২৫ মার্চ ফতুল্লায় ১০৮*) একটি শতরান আছে সিলেটের এ মিডল অর্ডার কাম অফস্পিনারের।২০১৮ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেই কোচিংয়ে যোগ দেন। প্রথম বছর কোচিং শুরু করেই

দেড়যুগ পর সিলেটকে জাতীয় লিগ চ্যাম্পিয়ন করানোর কৃতিত্ব আছে রাজিনের।এবারের বিপিএলে সিলেটের দুর্বার হয়ে ওঠার পেছনের নায়ক কিন্তু রাজিন সালেহ। পেছন থেকে নীরবে-নিভৃতে কাজ করে দলকে সংগঠিত করেছেন। মাঠে কার্যকর কৌশল

আঁটছেন রাজিন।তবে সিলেটের সাফল্যের পেছন থেকে নেপথ্য নায়কের ভূমিকা পালন করলেও তাতে যে মাশরাফির সহযোগিতাটাই বেশি ছিল, সেটা অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন রাজিন সালেহ। সে কথাই জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে সে গল্পই শুনিয়েছেন তিনি।

রাজিন সালেহ-এর সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বে শুনুন তার কোচ হয়ে সিলেটের দায়িত্ব নেয়ার পেছনে মাশরাফির অবদানের কথা-

জাগো নিউজ: বিসিএল, এনসিএল আর প্রিমিয়ার লিগে করলেও বিপিএলে কি এবারই প্রথম হেড কোচের দায়িত্ব পালন করছেন?

রাজিন সালেহ: পুরো আসরে প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করা হয়নি আগে। তবে ২০১৮ সালে আমি রাজশাহী রয়্যালসের হয়ে তিনটি ম্যাচে প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করেছি।

রাজিন: আমার দলের সেবার যিনি হেড কোচ ছিলেন, ভদ্রলোকের নাম আমি এখন মনে করতে পারছি না , একজন ইংরেজ হবেন। ঠিক কোয়ালিফায়ারের আগে মালিক পক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তিনি হঠাৎ চলে যান। তখন আমাকে তিন ম্যাচের অফার করা হয়। আমি রাজি হলে মালিক পক্ষ আমাকেই দল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়।

আমি কোয়ালিফায়ার ও ফাইনাল মিলে তিন ম্যাচে কোচিং করাই। আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের দয়ায় আমরা সেবার চ্যাম্পিয়নও হই। মোটকথা আমি খেলা ছাড়ার পর থেকেই বিপিএলের সঙ্গে যুক্ত হই। আর ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো তিন ম্যাচে প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করি। তবে সহকারি কোচের ভূমিকায় আছি সেই খেলা ছাড়ার পর থেকেই।

রাজিন: আমি ২০১৮ সালে খেলা ছেড়ে কোচিং শুরু করি। সেবারই বিপিএলে কোচিং করাতে শুরু করি। কোনোবার ফিল্ডিং কোচ, কোনো সময় ব্যাটিং কোচ কিংবা কোনোবার প্রধান সহকারি কোচের ভূমিকায়ও কাজ করেছি।

রাজিন: বলতে দ্বিধা নেই। একটু প্রেশার মনে হচ্ছিল। কারণ দায়িত্বটা ছোট নয়। বিরাট। এটা কোনো ছোট সিরিজ নয় যে, তিন ম্যাচের এক সিরিজ করে ফেললাম। একটি পুরো আসর। ব্যাপ্তি ও পরিধি অনেক বড়, বিস্তৃত। দায়িত্ব ও কর্তব্যও অনেক বেশি। রীতিমত একটা লম্বা সফর।

প্রেশার মনে হয়েছে। তবে তা কটাতে মাশরাফিরও একটা বড় ভূমিকা আছে। জানেন তো, মাশরাফি সিলেটের ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে অনেক সম্পৃক্ত। সে চাচ্ছিল যে সিলেটের কোচিংয়ের দায়িত্ব যেন সব দেশীয় কোচরাই পালন করে। কাজেই তার মধ্যস্থতায় মালিকপক্ষও আমাকে হেড কোচের প্রস্তাব দেয়।

অফিসিয়ালি তারা জানান, রাজিন ভাই আপনি আগাতে থাকেন। আমরা আছি। কোনো অসুবিধা নেই। সাহস পেলাম। তারপরও শুরু হয়ে গেল। এটা অনেক বড় পাওয়া। বড় ফরম্যাটে প্রথমবার পুরো আসরে কোচিং করানোর দায়িত্ব পালন করার সুযোগটা আমার জন্য সত্যিই বড় পাওয়া। আমি শিখছি।

রাজিন: সত্যি কথা বলতে কি! দল গঠনের পর মনে হয়নি যে এতদুর আসবো। দল এমন ভাল খেলবে। তবে প্র্যাকটিস শুরুর পর থেকেই বারবার মনে হচ্ছিল এই দলের ভাল খেলার ও করার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে।

রাজিন: আসলে প্র্যাকটিসের শুরুতেই আমার চোখে পড়ে পুরো দল এক সুতোয় গাঁথা। একটা অন্যরকম প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। একদম একটা পরিবারের মত। টিম স্পিরিটটা শুরু থেকেই ছিল দারুন। এছাড়া তারকা খেলোয়াড় কম, তবে পারফরমার বেশি।

আমরা প্লেয়ার্স ড্রাফটে নামি ও দামি তারকা তেমন পাইনি। তবে তৌহিদ হৃদয়, জাকির হাসান আর নাজমুল হোসেন শান্তকে নিতে পেরেছিলাম। যাদের তিনজনকেই আমি কাছ থেকে দেখেছি। তৌহিদ হৃদয় আর জাকির হাসানের সাথে আমি ‘এ’ দলে কাজ করেছি। খুব কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে তাদেরকে। জানা ছিল দুজনই ভাল ‘টাচে’ আছে। এছাড়া শান্তকে আমি বরাবরই ভাল প্লেয়ার বলে জানি। তাদের সমন্বয়ে দলটা মাঠে ভাল খেলবে এমন বিশ্বাস ছিল।

তবে আমাদের সিলেট স্ট্রাইকার্সের প্রতি আমার আস্থা জন্মায় আসলে একটি প্র্যাকটিস ম্যাচে। আমরা বিপিএল শুরুর আগে বিকেএসেপিতে একটি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলি। সেখানে সবার উদ্যম, অনুপ্রেরণা আর ভাল করার দৃঢ় সংকল্প ও দুর্নিবার আকাঙ্খা দেখে আমি পুলক অনুভব করি। বলতে পারেন খুব ভালো বোধ করি। তখনই বুঝি আমাদের পারস্পরিক আস্থা অনেক বেশি। টিম স্পিরিট প্রচুর এবং মাঠে ‘টিম’ হিসেবে খেলতে পারবো। তখনই আসলে বিশ্বাস জন্মায় যে এই দল নিয়ে ভাল খেলা সম্ভব।

পাশাপাশি অধিনায়ক মাশরাফি আর অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমের ওপরও আস্থা ছিল অনেক। আমি জানি তারা কি পারে, কি ভূমিকা রাখতে পারবে! এবং জানতাম দুজনারই কার্যকর ভূমিকা থাকবে প্রচুর। টুর্নামেন্ট শুরুর পর তারা দারুন ভূমিকাও রেখেছে।

মাশরাফির কথা আর কি বলবো? তার নেতৃত্ব দক্ষতা অসাধারণ। একটা দলকে একটা পরিবারের মত করে গড়ে তুলতে পারে। সবার মাঝে সম্প্রীতি, একতা, ঐক্য গড়ায় মাশরাফির জুড়ি নেই। টিম স্পিরিট তৈরির কাজে মাশরাফি অনন্য। টিমটা গোছাতে পারে। গুছিয়েছেও। আর বাইরে থেকে কি মনে হয় জানি না, আমাদের সিলেট স্ট্রাইকার্সকে দল হিসেবে গোছাতে এবং ভাল খেলতে মুশফিকুর রহিমও অনেক ‘ইনপুট’ দিয়েছে।