পুলিশ খুনের মামলার পলাতক আসামির দাওয়াতে দুবাইয়ে সাকিব!

ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশের স্বাদ পাইয়ে দিয়ে রাতেই দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন বাংলাদেশ অধিনায়ক ও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। সেখানে তিনি একটি স্বর্ণের দোকানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

এখান পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর এক চিত্র। সাকিব যে অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন তার মালিক পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক পরিদর্শক খুনের মামলার পলাতক আসামি।

তার নাম রবিউল ইসলাম ওরফে আপন ওরফে সোহাগ ওরফে হৃদয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (খিলগাঁও জোনাল টিম) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহিদুর রহমান বলেন, আরাভ জুয়েলারি শপ উদ্বোধনের বিষয়টি ফেসবুকে শেয়ার

করার পর তা আমাদের নজরে এসেছে। পরিদর্শক মো. মামুন এমরান খান হত্যা মামলার আসামি রবিউল আরাভ নামে ফেসবুক আইডি চালাচ্ছেন। তার দুটি পাসপোর্ট আমাদের কাছে এসেছে। একটি বাংলাদেশি, অপরটি ভারতীয়। তার

বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি। শুধু সাকিবই নয় বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকাই সেই জমকালো উদ্বোধনে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টি

নিয়ে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেই চলছে তোলপাড়। তাদের বিস্ময়, খুনের মামলার এক আসামি কীভাবে দুবাই গিয়ে এত সম্পদের মালিক হলো!আরাভ খানের জুয়েলারি শপের উদ্বোধন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভিডিওবার্তা দিয়েছেন

ইংলিশ ক্রিকেটার বেনি হাওয়েল, শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের পেসার উসুরু উদানা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি ওপেনার এভিন লুইস, সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক রোহান মোস্তফা, আফগানিস্তানের হজরতউল্লাহ

জাজাই, পাকিস্তানের ক্রিকেটার মোহাম্মদ আমিরসহ অনেকে।বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিচালক দেবাশীষ বিশ্বাস, গায়ক নোবেল, রুবেল খন্দকার, বেলাল খান, জাহেদ পারভেজ পাভেল এই জুয়েলার্সের উদ্বোধন উপলক্ষে দুবাই যাচ্ছেন

বলে তারাও ভিডিওবার্তায় জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ৮ জুলাই রাতে নিখোঁজ হন এসবির পরিদর্শক মামুন ইমরান খাঁন। পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজ না পেয়ে পরদিন সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি)

করেন। সেই জিডির তদন্ত করতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম জানতে পারে, রহমত নামে এক বন্ধুর সঙ্গে মামুন ইমরান বনানীর একটি বাসায় আফরিন নামে এক কথিত মডেলের জন্মদিনের পার্টিতে গিয়েছিলেন। সেখানে

আফরিনের সহযোগীরা তাকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে করা হয়। সেই লাশ উদ্ধার করা হয় গাজীপুরের একটি বাঁশঝাড় থেকে।দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ পুলিশ রবিউল ইসলাম

ওরফে আপন ওরফে সোহাগ ওরফে হৃদয় ওরফে হৃদিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। এ সময় রবিউল ইসলাম ওরফে আপন পলাতক ছিলেন। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর

রবিউল ইসলাম ওরফে আপন নামে ওই ব্যক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।এ মামলার ৬ নম্বর আসামি হলেন আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলাম ওরফে আপন ওরফে সোহাগ ওরফে হৃদয়। তিনি পলাতক। কিন্তু তার পরিবর্তে আবু ইউসুফ

লিমনকে ২০২১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করানো হয় এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।জানা যায়, পুলিশ পরিদর্শক মামুন ইমরান খান হত্যাকাণ্ডে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আপনের

বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার আশুতিয়ায়। তার বাবার নাম মতিউর রহমান মোল্লা। আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আপন নিজেকে বাঁচানোর জন্য ফন্দি আঁটেন। কৌশলে চাঁদপুরের কচুয়া থানাধীন সিংআড্ডা এলাকার

নুরুজ্জামানের ছেলে আবু ইউসুফকে অর্থের প্রলোভনে তার বদলে আদালতে আত্মসমর্পণ করাতে রাজি করেন। অর্থের লোভে আবু ইউসুফ নিজেকে রবিউল ইসলাম ওরফে আপন পরিচয় দিয়ে আত্মসমপর্ণ করে। আদালত আবু ইউসুফকে কারাগারে

পাঠায়। পরে আপন তার পরিবারকে অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিলে ইউসুফ বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষকে জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর দায়রা জজ ফয়সল আতিক বিন কাদির ২০২১ সালের ২ মার্চ বিষয়টি তদন্ত করার জন্য মহানগর গোয়েন্দা

পুলিশকে আদেশ দেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে রবিউল ইসলাম ওরফে আপনের নামে আবু ইউসুফের কারাবন্দি থাকার বিষয়টির প্রমাণ পায়।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিজের বদলে আবু ইউসুফকে কারাগারে

পাঠানোর আগেই আপন ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২০ সালের ২৮ জুলাই তিনি পশ্চিমবঙ্গের নরেন্দ্রপুর উদয় সংঘ ক্লাব এলাকার বাসিন্দা হিসেবে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি করেন। জালিয়াতি করে বানানো ওই পাসপোর্টে তার বাবার

নাম হিসেবে ব্যবহার করেন জাকির খান, মায়ের নাম দেন রেহানা বিবি খান এবং স্ত্রীর নাম সাজিমা নাসরিন। তার ভারতীয় পাসপোর্ট নম্বার ইউ ৪৯৮৫৩৮৯।সূত্র জানায়, ভারতীয় পাসপোর্ট সংগ্রহ করে আপন আরাভ নাম নিয়ে দুবাই

যাতায়াত শুরু করেন। তার পাসপোর্টে শেনজেন ভিসাও রয়েছে।ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, রবিউল ইসলাম ওরফে আপনের বাংলাদেশি একটি পাসপোর্টও তারা পেয়েছিলেন। হৃদি শেখ নামে ওই পাসপোর্টের

(নম্বর এনও ০৩৮৫১৮৮) সূত্র ধরে পুলিশের বিশেষ শাখায় চিঠি দিয়ে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়। কিন্তু তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশত্যাগ করেননি।
এদিকে দুবাইয়ে তার কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়,

২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি ভিসা পান তিনি। সেখানে তার রেসিডেন্ট আইডেন্টিটি হয়েছে। সেখানে তার জাতীয়তা ভারতীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুবাইয়ে তিনি ২০২১ সালের

২৬ অক্টোবর আরাভ খান টেকনিক্যাল সার্ভিসেস কন্ট্রাকটিং এলএলসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। এ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নম্বর ৯৯৬১৩৯। মেম্বারশিপ নম্বর ৩৭৭০৯৭। রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৬২৭৮২৪। এর ৪৮ শতাংশ শেয়ার আরাভের, ৪৮ শতাংশ স্ত্রী সাজেমার এবং ৪ শতাংশ শেয়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক হামদা আলি হাতিম আলি আলবালুসির।