এবি ডি ভিলিয়ার্স, বাবর-কোহলিকে পেছনে ফেলে আমি ‘গ্লোবাল সুপারস্টার’ হতে চাই: নাজমুল হোসেন শান্ত

তখনো চন্দিকা হাতুরাসিংহে ঢাকায় এসে পৌঁছাননি। ঝটিকা সফরে ঢাকা ঘুরে যাওয়া ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির মুখেও উচ্চারিত হয়নি তাঁর নাম। সেই সময়েই মাসুদ পারভেজ-কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে নাজমুল

হোসেন শান্ত বললেন মনের কোণে পুষে রাখা নিজের বড় স্বপ্নের কথা। বললেন সম্ভাব্য বিরূপ মন্তব্যের ভয় উপেক্ষা করেই।প্রশ্ন : একটু পেছন থেকেই শুরু করি। ২০১৩-র বিপিএলের সময় চলছিল অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ।

রাজশাহীর হয়ে আসর সর্বোচ্চ ৫৫৮ রান করেই বলেছিলেন, একদিন বিপিএলেও খেলতে চান। তো সেই বিপিএলেই এবার প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে ৫০০-র বেশি রান করলেন। সেরা খেলোয়াড়ও হলেন আসরের। সেই সময়টা মনে

পড়ছিল কি?নাজমুল হোসেন শান্ত : এটি বলতে পারি যে কোনো একদিন বিপিএলের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নও আমি তখন থেকেই দেখতে শুরু করেছিলাম। স্বপ্ন দেখতাম ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও (ডিপিএল) বড় কিছু করার। আমাদের

সেরা টুর্নামেন্ট বলতে তো এই দুটোই। যদিও কলাবাগান ক্রিকেট একাডেমির হয়ে ডিপিএলের প্রথম মৌসুমটা আমার একদমই ভালো যায়নি। কয়েক বছর আগে এই আসরেও আমি আবাহনীর হয়ে সর্বোচ্চ ৭৪৯ রান করেছি। ছোট্ট দুটো স্বপ্ন

ছিল আমার, দুটোই পূরণ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।প্রশ্ন : ক্রিকেটার হওয়ার পথে আপনার শুরুটাও খুব কষ্টকর ছিল। রাজশাহীতে নিজের গ্রাম রণহাট থেকে সাইকেল চালিয়ে আসতেন কাটাখালী নামের একটি জায়গায়। সেখানে একটি

গ্যারেজে সাইকেল রেখে বাসে উঠতেন। রেলগেট বাসস্টেশনে নেমে ইজি বাইকে আরো কিছুদূর, এরপর বাকি পথ হেঁটে ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে কি মনে হয় যে প্রতিদিনের সেই ক্লান্তিকর যাত্রা সার্থক হয়েছে?

নাজমুল : সেই কষ্টের কিছুটা ফল তো পেয়েছিই। তবে যে জায়গায় যাওয়ার জন্য কষ্টটা করেছিলাম, সেখানে পৌঁছাতে এখনো অনেকটা পথ বাকি। যা আমি হতে চেয়েছি, তার কিছুই এখনো হতে পারিনি। বড় যে স্বপ্নটি আমি সব সময়ই

দেখেছি, সেটি পূরণ হয়নি। আমি কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছি। বলতে পারেন, ছোটবেলার কষ্টটা আমাকে স্বপ্নপূরণের রাস্তায় তুলে দিয়েছে।প্রশ্ন : সেই বড় স্বপ্নটার কথাও বলুন শুনি।
নাজমুল : দেশের হয়ে তো খেলছিই, স্বপ্ন দেশের জন্য

বড় কিছু করা। আমি ওয়ার্ল্ড ক্লাস খেলোয়াড় হতে চাই। তিন সংস্করণে যারা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়, তাঁদের মতোই একজন হতে চাই। বাংলাদেশে যাঁরা সফল, তাঁদের মতো না। বিশ্বের মধ্যেই আমি অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হতে চাই। যদিও এটি

মুখে বলা সহজ। আমি এটি বললাম, আপনি লিখবেনও। তাতে অনেকের অনেক ধরনের প্রতিক্রিয়াও শোনা যেতে পারে। কিন্তু আমার স্বপ্ন তো আমারই।প্রশ্ন : আগে যেটি মোহাম্মদ আশরাফুল ছিলেন, এখন সাকিব আল হাসান। যাকে

বলে বৈশ্বিক মহাতারকা। আপনি সেরকম কিছুই হতে চান তো?নাজমুল : একদম তা-ই। দেশের সীমানায় আটকে থাকতে চাই না। আমি গ্লোবাল সুপারস্টার হতে চাই।প্রশ্ন : সাকিবের সংস্পর্শে তো আছেনই। এ রকম বৈশ্বিক মহাতারকার

কাছাকাছি থাকলে কি তাঁদের মতোই হতে ইচ্ছা করে? জানতে চাচ্ছি, ওই ব্যাপারটি একটু বেশিই টানে কি না?নাজমুল : অবশ্যই। ছোটবেলা থেকেই আমার আইডল সাকিব আল হাসান। ছোটবেলায় ক্রিকেট বলে অনুশীলন শুরু করাও তাঁকে

দেখেই। তারিখটা আমার ঠিক মনে নেই। যেদিন তিনি আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে প্রথমবার বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার হলেন, সেদিন থেকে স্বপ্ন দেখার শুরু আমারও। উনিই দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বসেরা হওয়া সম্ভব। ওনার অর্জন

আমাকেও টানে। উনি পারলে আমি কেন নয়? আর কথা হলে উনিও অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। বলেন যে ওনার থেকেও নাকি বড় কিছু হওয়া সম্ভব। এখন একই ড্রেসিংরুম শেয়ার করি বলে ওনার অনেক কিছু আমি নেওয়ার চেষ্টা করি। তাই

বলে কপি করি না। কপি করা সম্ভবও না। কারণ আমার আর সাকিব ভাইয়ের ব্যাটিং একদম আলাদা প্যাটার্নের। তবে ওনার চিন্তা-ভাবনা ও অনুশীলনের ধরন দেখে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি।প্রশ্ন : সাকিবের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতিটা মনে আছে নিশ্চয়ই?

নাজমুল : হ্যাঁ, অনূর্ধ্ব-১৫ দলের শিবিরে। মিরপুরের একাডেমি ভবনে একদিন ফাহিম স্যার (নাজমুল আবেদীন) ওনাকে নিয়ে এসেছিলেন। সেই প্রথম দেখা। ওনার সঙ্গে দেখা হবে ভেবে আগের দিন থেকেই খুব রোমাঞ্চিত ছিলাম। উনি বিশ্বসেরা

অলরাউন্ডার হওয়ার পরের ঘটনা এটি, ২০১০ সালে।প্রশ্ন : সাকিব এমন কোনো কথা কি আপনাকে বলেছেন, যেটি মনে গেঁথে আছে?নাজমুল : আছে তো। খুবই ব্যক্তিগত হলেও আপনার সঙ্গে শেয়ার করছি। উনি আমাকে বলেছিলেন, নিজেকে

সব সময় বড় খেলোয়াড় ভাবতে। মাঠে হয়তো বিরাট কোহলি থাকতে পারেন। কিন্তু ভেতর থেকে নিজেকে তাঁর চেয়েও বড় খেলোয়াড় ভাবতে বলেন। কাউকে দেখানোর জন্য নয়, উনি এটি ভেতরেই রাখতে বলেন। সাকিব ভাইয়ের এই পরামর্শ কখনো

কখনো আমার খুব কাজেও দেয়।প্রশ্ন : এবার আরেকটি বিষয়ও আপনার মুখ থেকে না শুনলেই নয়। বাংলাদেশে দেখা যায় কোচ বদলায়, কিন্তু আপনার অবস্থান বদলায় না। চন্দিকা হাতুরাসিংহের আগের মেয়াদ থেকে শুরু করে সব বিদেশি

কোচেরই পছন্দের ক্রিকেটার আপনি। এমনি এমনি নিশ্চয়ই নয়। কোনো কারণ অবশ্যই আছে। আপনার নিজের কাছে কারণটি কী মনে হয়?নাজমুল : আমার পক্ষে তো এটি বলা মুশকিল। কোচের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কখনোই কিছু করিনি

আমি। নিজের উন্নতির জন্য যা যা করার দরকার, তা সৎভাবে করার চেষ্টা করেছি। এখন তাঁরা কেন পছন্দ করতেন, সেটি তাঁদেরই ভালো বলতে পারার কথা। তবে ধারণা করে বললে বলতে পারি, আমার ‘ওয়ার্ক এথিকস’ ওনাদের ভালো লেগে

থাকতে পারে। ম্যাচে যেমনই করি না কেন, ভালো কিংবা খারাপ, অনুশীলন থেকে শুরু করে সব কিছুতে আমার প্রক্রিয়া সব সময় একই থাকে। এটি একটি কারণ হলেও হতে পারে।প্রশ্ন : সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়ও আপনার ওপর দিয়ে কম যায়নি।

কোন মানসিক শক্তির জোরে এটি সামাল দিয়েছেন?নাজমুল : আমিই তো এ ক্ষেত্রে প্রথম নই। আমার আগেও এই ঝড় অনেককে সামাল দিতে হয়েছে। সামাল দিয়ে তাঁরা ভালোও খেলেছেন। শুরুর দিকে সমস্যা হতো। মানুষ তো, অন্যের কথায়

নজর চলে যেতই। তবে এখন বাইরের চাপ সামাল দেওয়া অনেকটাই শিখে গেছি। সব কিছুকে স্বাভাবিকভাবেই দেখতে শুরু করেছি। ভালো খেললেও ভেসে যাই না। কারণ ভালো খেললে আজ যিনি প্রশংসা করবেন, খারাপ করলে তিনিই দেখা যাবে

আবার শূলে চড়াচ্ছেন। আমি তাই খেলাটা উপভোগেই মন দিয়েছি। ছোটবেলায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে খেলতে চলে যেতাম তো উপভোগ করতাম বলেই। এখন সেই উপভোগের মন্ত্রেই ওসব জিনিস ভুলে থাকতে পারছি। আর আমি তো এমন কেউ না যে

আমাকে নিয়ে সমালোচনা হতে পারবে না। এভাবে ভাবাটাও কাজে দিচ্ছে।প্রশ্ন : আপনি না হয় পারছেন, পরিবারের সদস্যদের কী অবস্থা?নাজমুল : একসময় তারাও খুব আক্রান্ত হতো। অনেক সময়ই বাসায় গিয়ে দেখেছি, সবাই মুখ অন্ধকার

করে বসে আছে। হয়তো আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনে এসেছে। তবে এখন পরিবারের সদস্যরাও বুঝে গেছে এ রকম শুধু আমাকে নিয়েই হয় না, আরো অনেককে নিয়েও হয়। বলতে পারেন, তারাও অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন : ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম করেও অনেক ক্রিকেটারের জাতীয় দলে সুযোগ হয় না। নির্বাচকদের বলতে শুনি, বাংলাদেশের ঘরোয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অনেক ফারাক। আপনার নিজের কী মনে হয়?নাজমুল : সত্যি কথা।

ঘরোয়া ক্রিকেটে দু-একটি বড় দল বাদ দিলে বেশির ভাগ দলেই মানসম্মত বোলার বড়জোর দুজন। অন্যরা মোটামুটি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোটামুটি মানের বোলার বলে কিছু নেই, সবাই ভালো। তাই ঘরোয়া ক্রিকেটে যেভাবে খেলে সফল হয়েছেন,

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তা না-ও হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নিজেকে আবার বদলাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই আবার শুরু থেকে শুরু করতে হয়। বলা যেতে পারে আমরা দু-এক বছর পিছিয়েও যাই কখনো কখনো। ৮-১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পর

বোঝা যায়, নিজেকে অনেক বদলানোর আছে।প্রশ্ন : গত কয়েক বছরে ব্যাটিংয়ের দিক থেকে আসা নিজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি কী?নাজমুল : আগে যে কয়টা শট খেলতে পারতাম, এখন তার চেয়ে আরো বেশি পারি। পরিস্থিতি অনুযায়ী

ব্যাটিং করার দিক থেকে আগের চেয়ে একটু হলেও দক্ষ হয়েছি। অনুশীলনের প্যাটার্নও বদলেছে আমার। ম্যাচের সঙ্গে মিল রেখে অনুশীলনের চেষ্টা করি এখন। মনে হচ্ছে, অর্থপূর্ণ অনুশীলনই করছি আমি।প্রশ্ন : ম্যাচের সঙ্গে মিল রেখে

বলতে কেমন?নাজমুল : ম্যাচের পরিস্থিতি তো আর অনুশীলনে পাব না। তবু ম্যাচের মতো করে কিছু একটা করার চেষ্টা করি। ধরুন, টেস্ট ম্যাচে সকালবেলা ব্যাটিং করতে হবে আমাকে। আমি চেষ্টা করি সাতসকালেই অনুশীলনে গিয়ে নতুন

বলে খেলতে। যে চ্যালেঞ্জের মুখে আমাকে ম্যাচে পড়তে হবে, নক-টক না করে এখন সেভাবেই অনুশীলন শুরু করি।প্রশ্ন : চন্দিকা হাতুরাসিংহের আগের মেয়াদে আপনার টেস্ট অভিষেক। তিনি আবার ফিরছেন।

নাজমুল : ওনার সঙ্গে আমার বেশিদিন কাজই করা হয়নি। আশা করি, এবার অনেক কাজ করব। অনেক বড় স্বপ্ন দেখেই তাঁকে আবার ফেরানো হচ্ছে। আমারও স্বপ্ন আছে। সেটি তাঁর সময়ে ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে অন্য পর্যায়ে তুলে নেওয়ার।